রেকর্ড কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও বৈশ্বিক তালিকায় অবস্থান বদলায়নি চট্টগ্রাম বন্দরের

কনটেইনার ওঠানামায় রেকর্ড গড়লেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগোতে পারছে না চট্টগ্রাম বন্দর। ২০২৫ সালে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউ (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশেরও বেশি।

এরপরও লয়েডস লিস্টের ২০২৬ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রামের অবস্থান ৬৮তম, এর আগের তালিকাতেও একই স্থানে ছিল বন্দরটি। অর্থাৎ কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়লেও বৈশ্বিক অবস্থানে কোনো উন্নতি হয়নি। অথচ একই সময়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরের সম্মিলিত কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।

লন্ডনভিত্তিক শিপিংবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্টের র‌্যাংকিংটি মূলত কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ফলে বন্দরের আয়, জাহাজপ্রতি সময়, কনটেইনারের অবস্থানকাল, সরঞ্জামের উৎপাদনশীলতা কিংবা কাস্টমস ও পণ্য খালাসের দক্ষতা সরাসরি এ র‌্যাংকিংয়ে প্রতিফলিত হয় না।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২৫ সালে শুধু কনটেইনার নয়, অন্যান্য প্রধান সূচকেও রেকর্ড হয়েছে। ওই বছর বন্দরে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ টন কার্গো এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডল হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ চলাচল বেড়েছে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

চট্টগ্রাম বন্দরের বৈশ্বিক অবস্থান আটকে থাকার পেছনে শুধু কনটেইনার প্রবৃদ্ধির প্রশ্নই নয়, বন্দরের ভৌত সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। লয়েডস লিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত বর্তমান টার্মিনালগুলোয় জোয়ার-ভাটা, নাব্যতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় তিন হাজার টিইইউ সক্ষমতার বেশি বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানো যায় না। ফলে দেশের বড় অংশের বৈদেশিক বাণিজ্যের কনটেইনার কাছের আঞ্চলিক বন্দর হয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট করতে হয়। তবে এ সীমাবদ্ধতা কাটানোর ক্ষেত্রে সামনে আসছে বে-টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল।

লয়েডস লিস্টের তথ্যানুযায়ী, লালদিয়া টার্মিনাল ২০৩০ সালে চালু হলে বাংলাদেশের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা আট লাখ টিইইউর বেশি বাড়বে। নতুন টার্মিনালটিতে চট্টগ্রামের বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্বজুড়ে কনটেইনার পরিবহন খাতে চীনের আধিপত্য এবারো অব্যাহত রয়েছে। শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে দেশটির সাংহাই বন্দর। ২০২৫ সালে বন্দরটি দিয়ে ৫ কোটি ৫০ লাখ টিইইউ কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর বন্দর। ২০২৫ সালে বন্দরটি ৪ কোটি ৪৬ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে। ফলে আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা চীনের নিংবো-ঝুশান বন্দর হ্যান্ডল করেছে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টিইইউ কনটেইনার। আগের বছরের তুলনায় বন্দরটির কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দর দিয়ে ৭৯ কোটি ২২ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডল হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি বন্দরই চীনের। ফলে বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দেশটির অবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর মধ্যে ভারতের দুটি বন্দর এ তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে দেশটির মুন্দ্রা বন্দর ২৫তম ও জওহরলাল নেহরু বন্দরে ৩০তম হয়েছে। শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরের অবস্থান ২৯তম। অন্যদিকে পাকিস্তানের করাচি বন্দর রয়েছে ৮৪তম অবস্থানে। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান কনটেইনার বন্দরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান মাঝামাঝি। এ অঞ্চলে চট্টগ্রামের ওপরে রয়েছে মুন্দ্রা, কলম্বো ও জওহরলাল নেহরু বন্দর। ফলে কনটেইনার পরিবহনের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম এখনো শীর্ষ সারির বন্দরের পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের কী পরিমাণ কনটেইনার হ্যান্ডল হচ্ছে, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো বৈশ্বিক বন্দরগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কত দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানো যাচ্ছে। বর্তমান টার্মিনালগুলোর নাব্যতা ও বড় জাহাজ ভেড়ানোর সীমাবদ্ধতা, ট্রান্সশিপমেন্টনির্ভরতা এবং হিন্টারল্যান্ড সংযোগের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান উন্নত করা কঠিন হবে।’

আরও